download

মুসলিম নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার

মুসলিম নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার : ইসলামী বিধান ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আলোকে বিবাহ যেমন একটি সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন, তেমনি কখনো কখনো পারস্পরিক মতবিরোধ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, কিংবা নিরুদ্দেশ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে এই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। মুসলিম আইনেও যেমন বিবাহের নির্দেশনা রয়েছে, তেমনি বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক সম্পর্কেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। আমরা প্রায়শই দেখি যে, মুসলিম সমাজে পুরুষদের তালাক দেয়ার ক্ষমতা বা অধিকার খুব সহজভাবে চর্চিত হলেও নারীর তালাকের অধিকার নিয়ে অনেকেই অস্পষ্ট বা বিভ্রান্তিতে থাকেন। তবে বাস্তবতা হলো—ইসলামী শরিয়াহ এবং বাংলাদেশে প্রযোজ্য মুসলিম পারিবারিক আইন নারীকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দিয়েছে। মুসলিম নারীর তালাক প্রদানের বৈধ উপায়সমূহ: মুসলিম নারী কয়েকটি আইনি ও ধর্মীয় পদ্ধতির মাধ্যমে তার স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেন। নিচে প্রতিটি পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

✅

১.তালাক-ই-তৌফিজ (Delegated Divorce) কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করেন, তবে স্ত্রী সে ক্ষমতা প্রয়োগ করে স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। এটি “তালাক-ই-তৌফিজ” নামে পরিচিত। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭ ধারা অনুসারে তালাক কার্যকর হয়। স্ত্রী লিখিতভাবে তালাক ঘোষণা করে স্থানীয় চেয়ারম্যান/পৌরসভার মেয়র বরাবর এবং স্বামী বরাবর তালাকের নোটিশ পাঠান। নোটিশ প্রেরণের ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়। এই তালাক প্রক্রিয়া নারী কর্তৃক সম্পন্ন হলেও এটি স্বামীর পূর্বানুমোদিত ক্ষমতার প্রয়োগে হয়। ফলে এটি একটি আইনসঙ্গত ও বৈধ তালাক হিসেবে গণ্য হয়।

✅

২. খুলা তালাক (Khula Divorce) খুলা হলো নারীর পক্ষ থেকে তালাকের প্রস্তাব দেয়ার একটি পদ্ধতি, যেখানে স্বামী তা গ্রহণ করলে বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। এটি একধরনের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে তালাক। * স্ত্রী স্বামীর নিকট তালাক চেয়ে প্রস্তাব দেন। * স্বামী সম্মতি দিলে কাজী অফিসে গিয়ে তালাক কার্যকর করেন। * কখনো কখনো স্ত্রী দেনমোহরের কোনো অংশ ছেড়ে দিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। খুলা তালাকের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হয় না, তবে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে এটি বৈধতা পায়।

✅

৩. (Mubarat Divorce) মুবারত তালাক হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে স্বামী ও স্ত্রী দুজনই বিবাহ বিচ্ছেদে সম্মত হন। এটি একধরনের পারস্পরিক চুক্তিভিত্তিক তালাক। * উভয় পক্ষ লিখিতভাবে তালাকের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে কাজী অফিসে তালাক সম্পন্ন করেন। * উভয়ের সম্মতি থাকায় এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ বৈধ প্রক্রিয়া। মোসাম্মৎ গুলাম সখিনা বনাম উমর বখশ (১৬ ডিএলআর ৩৮৯)মামলায় আদালত বলেন, মুবারত তালাকের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা নেই।

✅

৪.আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ (Judicial Divorce) যেসব ক্ষেত্রে নারীর জন্য পূর্বের কোনো পদ্ধতি প্রযোজ্য নয় বা স্বামীর সম্মতি পাওয়া যায় না, সে ক্ষেত্রে নারী আদালতের শরণাপন্ন হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। * মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ এর ২ ধারা * এই ধারায় ৯টি নির্দিষ্ট ভিত্তি উল্লেখ রয়েছে যেগুলোর যেকোনো একটি প্রমাণিত হলেই স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে তালাকের অধিকারী হবেন। প্রধান কারণসমূহ: 1. স্বামীর নিষ্ঠুর আচরণ (শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন) 2. স্বামীর ৪ বছরের অধিক সময় অনুপস্থিত থাকা 3. ৭ বছর বা ততোধিক সময় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া 4. ২ বছরের বেশি সময় ভরণপোষণ না দেয়া 5. ধর্ম পালনে বাধা দেয়া, অবৈধভাবে যৌনাচারে বাধ্য করা 6. দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ ও প্রথম স্ত্রীকে অবহেলা 7. শারীরিক অক্ষমতা, যৌন অক্ষমতা প্রমাণিত হওয়া * সালমা খাতুন বনাম মোসলেম উদ্দিন (১৯ ডিএলআর ৫৫৩) মামলায় বলা হয় যে, স্বামী নির্যাতন করলে এবং স্ত্রী গৃহত্যাগ করে ভরণপোষণ না পেলে আদালত তালাক ডিক্রি দিতে পারেন।

⚖️

দেনমোহর ও তালাক: ভুল ধারণার সংশোধন একটি বড় ভুল ধারণা হলো: “স্ত্রী তালাক দিলে তার দেনমোহর পাওয়ার অধিকার থাকবে না।” এটি ভুল ও ভিত্তিহীন। * তালাক যেই করুক না কেন, দেনমোহর স্ত্রীর আইনগত অধিকার। * বিবাহ সম্পাদনের সঙ্গে সঙ্গে দেনমোহর প্রাপ্য হয়ে যায়। * স্বামী যদি তালাক দেন, অথবা স্ত্রী খুলা বা আদালতের মাধ্যমে তালাক চান—সবক্ষেত্রেই দেনমোহর প্রযোজ্য। * এটা পরস্পরের চুক্তিভিত্তিক এবং আদালত কর্তৃক বাস্তবায়নযোগ্য দাবি। ইসলাম এবং বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। একজন মুসলিম নারীও তার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার অধিকার রাখেন, তবে সেটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্তসাপেক্ষ। সমাজে তালাক বিষয়টি নেতিবাচক চোখে দেখা হলেও, কোনো নারী যদি নির্যাতিত হন, তার প্রতি দায়িত্ব পালন করা না হয় কিংবা স্বামী যদি অনুপস্থিত বা অক্ষম হন—তাহলে সেই নারীর উচিত আইনানুগ পথে বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়া। এই অধিকার প্রয়োগ নারীকে ছোট করে না, বরং এটি একটি সম্মানজনক জীবনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। আইনগতভাবে সঠিক প্রক্রিয়া মেনে তালাক কার্যকর করাই একজন সচেতন মুসলিম নারীর সিদ্ধান্ত হতে পারে। ঠিকানা: ৩৫৪/ক, বিষ্ণুপুর পানি ট্যাংকি, কাপ্তান বাজার, আদর্শ সদর, কুমিল্লা

📞

01886087206 | 01893391925 | 01878525394

📩

helix.legal.counsel@gmail.com #মুসলিম_নারীর_অধিকার #বিবাহবিচ্ছেদ #তালাক_আইন #নারীর_আইনি_সচেতনতা #Helix_Legal_Counsel #Islamic_Law #Family_Law #Khula #Talaq

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *