download (10)

মুসলিম নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক মুসলিম আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

স্বাধীনতার সীমানা: মুসলিম নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক মুসলিম আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সাধারণভাবে আমরা জানি, একজন মুসলিম পুরুষ তার স্ত্রীকে বৈধ কারণ সাপেক্ষে তালাক দিতে পারেন। কিন্তু একজন মুসলিম নারীর তালাক প্রদানের অধিকার নিয়ে অনেক সময়ই ধোঁয়াশা তৈরি হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইনে নারীর তালাক প্রদানের অধিকার রয়েছে, তবে তা কিছু শর্তসাপেক্ষ। এই নিবন্ধে আমরা মুসলিম নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার ও এর আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করব। মুসলিম নারীর তালাক প্রদানের পদ্ধতি মুসলিম আইনে নারীকে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে এই অধিকার প্রয়োগের জন্য কিছু আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। নিম্নে সেগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো: ১. তালাক-ই-তৌফিজ তালাক-ই-তৌফিজ হলো কাবিননামার ১৮নং কলামের মাধ্যমে স্ত্রীকে প্রদত্ত তালাকের ক্ষমতা। এই ক্ষমতা বলে স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭ ধারা অনুসরণ করতে হয়। তালাক প্রদানের পর স্ত্রীকে তালাক রেজিস্ট্রেশন করতে হবে এবং তালাকের নোটিশের এক কপি পৌর/সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে ও এক কপি স্বামীর ঠিকানায় পাঠাতে হবে। নোটিশ প্রেরণের ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে। ২. খুলা তালাক খুলা তালাক হলো স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ। এখানে স্ত্রী তালাকের প্রস্তাব দেন এবং স্বামী তা গ্রহণ করেন। এই প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষকে কাজী অফিসে উপস্থিত হয়ে তালাক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। খুলা তালাকের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই সংসার ছিন্ন করার ব্যাপারে সম্মত থাকেন। ৩. মুবারত মুবারত হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে উভয় পক্ষ বিচ্ছেদের জন্য সম্মত হন। এই প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষ একে অপরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। মুবারতের মাধ্যমে তালাক সম্পন্ন হলে তা আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৈধ বলে গণ্য হয়। ৪. আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ যদি একজন মুসলিম নারী তালাক-ই-তৌফিজ, খুলা বা মুবারতের মাধ্যমে তালাক দিতে না পারেন, তাহলে তিনি আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ এর ২ ধারা অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে একজন নারী আদালত থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি পেতে পারেন। যেমন: – নিষ্ঠুর আচরণ: স্বামী যদি শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করেন, তাহলে স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করতে পারেন। নিষ্ঠুর আচরণের মধ্যে রয়েছে সম্পত্তি জোরপূর্বক হস্তান্তর, ধর্মীয় কাজে বাধা দেওয়া, অনৈতিক জীবনযাপনে বাধ্য করা ইত্যাদি। – স্বামীর নিরুদ্দেশ হওয়া: যদি স্বামী চার বছর বা তার বেশি সময় ধরে নিরুদ্দেশ হন, তাহলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। – ভরণপোষণ না দেওয়া: যদি স্বামী দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে স্ত্রীর ভরণপোষণ না দেন, তাহলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। তালাকের পর দেনমোহরের অধিকার অনেকের ধারণা, স্ত্রী তালাক দিলে তার দেনমোহরের অধিকার খর্ব হয়। কিন্তু এই ধারণা ভুল। তালাক যেই দিক না কেন, দেনমোহর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। দেনমোহর হলো স্ত্রীর আইনি অধিকার, যা তালাকের সাথে সম্পর্কিত নয়। তালাক না হলেও দেনমোহর পরিশোধ করতে হয়। শেষ কথা ইসলামিক ও রাষ্ট্রীয় আইন উভয়ই মুসলিম নারীকে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দিয়েছে। যদিও তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ একটি কঠিন সিদ্ধান্ত, তবুও কিছু পরিস্থিতিতে এটি অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। মুসলিম নারীরা তালাক-ই-তৌফিজ, খুলা, মুবারত বা আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার প্রয়োগ করে তাদের জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে পারেন। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তারা তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *