ভ্রাম্যমাণ আদালত: নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কতটা সফল? খাদ্য শুধু পেট ভরানোর উপকরণ নয়, এটি সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের পূর্বশর্ত। কিন্তু বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য এক ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ কার্যকর করা হয়। এই আইনের অধীনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে, যাতে অবিলম্বে ভেজাল ও অনিয়ম প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ভ্রাম্যমাণ আদালত আসলেই কতটা কার্যকর? এটি কি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারছে, নাকি এটি শুধু সাময়িক শাস্তির ব্যবস্থা? নিরাপদ খাদ্য আইন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর অধীনে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য হলো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ আইনের ৭৫ ধারা মোতাবেক মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার বিধান রাখা হয়েছে। এই আদালত প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ করতে পারে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। তবে এটি একটি সীমিত এখতিয়ারসম্পন্ন ব্যবস্থা, যা মূল বিচারিক আদালতের বিকল্প নয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যকারিতা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হওয়ার পরও খাদ্যে ভেজাল ও মানহীন খাদ্য বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এটি তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। ১. ইতিবাচক দিকসমূহ:
দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি: √ নিরাপদ খাদ্য আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত দ্রুত অভিযান চালাতে পারে। √ মিডিয়ায় প্রচারের ফলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
অবৈধ খাদ্য ব্যবসায়ীদের সাময়িক নিয়ন্ত্রণ: √ ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক জরিমানার কারণে অনিয়ম করতে ভয় পায়। √ অনেক প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল পণ্য বিক্রি থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকে।
খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার তদারকি বৃদ্ধি: √ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের কার্যক্রম নজরদারি বাড়ায়। √ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা তৈরি হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের সীমাবদ্ধতা
স্থায়ী সমাধান নয়: √ ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিক জরিমানা করতে পারলেও অপরাধের মূল কারণ দূর করতে পারে না। √ ব্যবসায়ীরা জরিমানা দিয়ে আবারও অনিয়মে ফিরে যায়।
মূল অপরাধীদের শাস্তি হয় না: √ বড় ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। √ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
দীর্ঘমেয়াদি বিচারপ্রক্রিয়ার অভাব: √ বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের কার্যক্রম তুলনামূলক কম প্রচারিত হয়। √ আইনি কাঠামোর দুর্বলতার কারণে মূল মামলাগুলো নিয়মিত আদালতে পৌঁছায় না।
প্রশাসনিক জরিমানার সীমাবদ্ধতা: √ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে, যা অনেক বড় ব্যবসায়ীর জন্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় মাত্র। √ পুনরায় অপরাধ করলে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান থাকলেও এর প্রয়োগ সীমিত। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে করণীয়
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা: √ বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। √ নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বৃদ্ধি: √ শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজন হলে কারাদণ্ডের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। √ খাদ্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে স্থায়ী মামলা দায়েরের বিধান কার্যকর করতে হবে।
ভোক্তাদের অংশগ্রহণ ও অভিযোগের সুযোগ বৃদ্ধি: √ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের হটলাইন চালু করে তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ করতে হবে। √ সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তাদের অভিযোগ দায়েরের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
বড় ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: √ শুধুমাত্র ছোট দোকান বা ব্যবসায়ী নয়, বরং খাদ্য সরবরাহের মূল উৎস ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। √ খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত তদারকি করতে হবে। শেষকথা ভ্রাম্যমাণ আদালত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ভূমিকা রাখলেও এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মূল বিচারিক আদালতের কার্যক্রম জোরদার না হলে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এবং কঠোর তদারকি না থাকলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সতর্ক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার সমন্বয় ঘটিয়ে খাদ্যে ভেজাল ও অনিয়ম রোধ করতে হবে। শুধু জরিমানা নয়, চাই শাস্তি ও কঠোর আইন প্রয়োগ!
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কতটা সফল
with
no comment




