download (15)

হক শুফা: ন্যায়সঙ্গত অধিকার নাকি আইনি লড়াই?

হক শুফা: ন্যায়সঙ্গত অধিকার নাকি আইনি লড়াই? ভূমি সংক্রান্ত আইন ও এর বাস্তবায়ন চিরকালই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। মুসলিম আইনে “হক শুফা” বা অগ্রক্রয়ের অধিকার এক বিশেষ বিধান, যা শরীক (সহ-মালিক) বা প্রতিবেশীকে জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়। এটি সামাজিক ভারসাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৈরি হয়েছে, যাতে জমির স্বাভাবিক মালিকানা সম্পর্ক বজায় থাকে এবং বহিরাগতদের হঠাৎ দখলের ফলে স্থানীয় অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। হক শুফার ভিত্তি: ইসলামী দৃষ্টিকোণ মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন— “যার জমি আছে এবং যদি সে জমি বিক্রির ইচ্ছা করে, তবে তার উচিত প্রথমে তার প্রতিবেশীকে জানানোর।” এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার কতটা গুরুত্ব বহন করে। একইভাবে, সহ-শরীক ও সংলগ্ন ভূমির মালিকদের ক্ষেত্রেও এই নীতির প্রয়োগ রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে হক শুফার বিকাশ ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের ভিত্তিতে প্রথম ১৯১৩ সালে পাঞ্জাব হক শুফা আইন প্রণীত হয়। পরবর্তীতে ১৯২৮ সালে বঙ্গীয় প্রজা স্বত্ব আইন ১৮৮৫ সংশোধন করে ২৬(চ) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে সহ-শরীকদের অগ্রক্রয়ের অধিকার স্বীকৃতি দেয়। যদিও সময়ের পরিক্রমায় এই বিধান বাতিল হয়, তবু মুসলিম আইন, ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, এবং ১৯৪৯ সালের অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন এখনো এই অধিকার সংরক্ষণ করে। কোন ব্যক্তি হক শুফার অধিকার দাবি করতে পারেন? মুসলিম আইনে তিন শ্রেণির ব্যক্তি এই অধিকার দাবি করতে পারেন— শাফী-ই-শরিক: বিক্রিত ভূমির সহ-মালিক (শরীক)। শাফী-ই-খালিত: যিনি বিক্রিত ভূমির মাধ্যমে রাস্তা, পানি নিষ্কাশন ইত্যাদির সুবিধা পান। শাফী-ই-জার: সংলগ্ন ভূমির মালিক। এদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ব্যক্তির অধিকার সবচেয়ে বেশি। তিনি দাবির সুযোগ না নিলে দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যক্তি, এরপর তৃতীয় শ্রেণির ব্যক্তি এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। হক শুফা দাবি করার আইনি পদ্ধতি শুফার অধিকার কার্যকর করার জন্য মুসলিম আইনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা জরুরি— তলব ই মৌসিবত: শুফার দাবিদারকে জমি বিক্রির সংবাদ শোনার পরপরই তার অধিকার দাবি করতে হবে। তলব ই ইশাদ: শুফার দাবিদারকে জমি কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে এবং তা সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ঘোষণা করতে হবে। বাংলাদেশের আদালতে হক শুফার মামলা করতে চাইলে, এই দুটি ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করার প্রয়োজন হয়। “মোসাঃ রোকেয়া বেগম বনাম এ্যাড. আব্দুল আউয়াল” মামলায় হাইকোর্ট রায় দিয়েছে যে, শুফার দাবিদারকে যত দ্রুত সম্ভব তার অধিকার ঘোষণা করতে হবে। হক শুফার দাবির সময়সীমা যদিও মুসলিম আইনে হক শুফার দাবির নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, তবে ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের অনুচ্ছেদ ১০ ও ১২০ অনুসারে— যদি জমির দখল হস্তান্তর হয়ে থাকে, তাহলে এক বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। যদি জমির দখল হস্তান্তর না হয় এবং দলিল রেজিস্ট্রিও না হয়, তাহলে অনুচ্ছেদ ১২০ অনুসারে দীর্ঘমেয়াদি সময়সীমা প্রযোজ্য হবে। মুসলিম আইন বনাম অন্যান্য আইনের সুবিধা বর্তমানে হক শুফার অধিকার রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এবং অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ দ্বারাও সংরক্ষিত। তবে এই আইনে মামলা করতে হলে বিক্রয় মূল্যের ১০-২৫% টাকা আদালতে জমা দিতে হয়। কিন্তু মুসলিম আইনে এমন কোনো আর্থিক শর্ত নেই, যা মুসলিম আইনের অধীনে শুফার দাবি করা সহজ করে তোলে। উপসংহার হক শুফা মূলত একটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার, যা প্রতিবেশী ও শরীকদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি একদিকে যেমন সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে, অন্যদিকে ত্বরিত প্রতিক্রিয়া না জানালে দাবিদার তার অধিকার হারাতে পারেন। ফলে মুসলিম আইনানুযায়ী “লাফ দিয়ে তলব ই মৌসিবত” করার গুরুত্ব অপরিসীম। অতএব, হক শুফার অধিকার যথাযথভাবে দাবি করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানসমূহ জানা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Shahria
Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *